কমল মূল্যস্ফীতি, স্বস্তি এলো না বাজারে

ময়দা, চিনি, ভোজ্যতেল, ডিম-মুরগিসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম চড়া, কোনো কোনো পণ্যের দাম আবার নতুন করে বাড়ছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে হস্তচালিত বেকারিগুলোও পাউরুটি, কেক ও বিস্কুটের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বাড়াচ্ছে
আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ের ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। কাগজে এটি স্বস্তির খবর। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখা যাচ্ছে উল্টো ছবি।
ময়দা, চিনি, ভোজ্যতেল, ডিম-মুরগিসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম চড়া, কোনো কোনো পণ্যের দাম আবার নতুন করে বাড়ছে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে হস্তচালিত বেকারিগুলোও পাউরুটি, কেক ও বিস্কুটের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বাড়াচ্ছে।
তাহলে মূল্যস্ফীতি কমছে কোথায়?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে মূল্যস্ফীতির হিসাবেই। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের বছরের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমা। গত বছরের আগস্টে কোনো পণ্য ও সেবার ঝুড়ি কিনতে ১০০ টাকা লাগলে এ বছরের আগস্টে একই ঝুড়ির জন্য গড়ে ১০৮ টাকা ২৬ পয়সা খরচ হচ্ছে।
আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাসওয়ারি হিসাব বলছে, জুলাই থেকে আগস্টে খাদ্যের মূল্যসূচকই বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ বার্ষিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও আগস্ট মাসেই খাবারের দাম আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বেকারির আগে চাপ কাঁচামালে
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কয়েকটি বাজারে খোলা আটা কেজিতে ৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে, এক সপ্তাহ আগে যা ছিল প্রায় ৪৫ টাকা। একই সময়ে ময়দা ৭০-৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮০-৮৫ টাকায় উঠেছে। চিনির দামও কয়েক সপ্তাহে কেজিতে প্রায় ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এর সঙ্গে বেড়েছে ভোজ্যতেলের চাপ। ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। দাম বাড়ানোর পরও সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজধানীর অনেক দোকানে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
এই কাঁচামালগুলোই বেকারি শিল্পের প্রধান উপকরণ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ময়দা, চিনি, তেল ও ডালডার মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও শ্রম ব্যয় বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ সামলাতে পণ্যের দাম বাড়ানো বা কমদামি পণ্যের ওজন কমানো ছাড়া উপায় থাকছে না।
বিশ্ববাজারেও চাপ রয়েছে। আগস্টে এফএওর হিসাবে গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক দাম বেড়েছে। বাংলাদেশের গম ও ভোজ্যতেলের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারেও প্রভাব ফেলে।
ডিম-মুরগি-মাছেও স্বস্তি সীমিত
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার বাজারে এক ডজন ডিম ১৫০-১৬৫ টাকা, ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৯০-২০০ টাকা এবং গরুর মাংস ৮০০ টাকার ওপরে বিক্রি হয়েছে। মাছের বাজারেও তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০-২৫০ এবং রুই-কাতলা প্রায় ৩৮০-৪২০ টাকার মধ্যে ছিল।
চালের বাজারে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভিন্ন। সরকারি মজুদ ২০ লাখ টনের বেশি এবং চলতি মৌসুমে ধানের উৎপাদন পূর্বাভাসও ইতিবাচক। তবে সুগন্ধি চালের দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
খাদ্যের বাইরেও খরচ বাড়ছে
বাজারে স্বস্তি না ফেরার আরেকটি কারণ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়। আগস্টে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও পরিবারকে চাপে রাখছে।
এর সঙ্গে রয়েছে আয়ের প্রশ্ন। আগস্টে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশের নিচে। ফলে গড়ে আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ক্ষয় পুরোপুরি কাটেনি।
দ্রুত পুরোনো দামে ফেরার সম্ভাবনা এখন সীমিত। গ্যাস সরবরাহ বাড়লে বেকারি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ের কিছুটা চাপ কমতে পারে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমন ধান বাজারে এলে চালের বাজারে স্বস্তির সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু চিনি, গম ও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে বড় ধরনের দরপতন কঠিন।
তাই আগস্টের মূল্যস্ফীতি কমার পরিসংখ্যান ইতিবাচক সংকেত হলেও সেটি বাজার স্বাভাবিক হওয়ার প্রমাণ নয়। কয়েক বছর ধরে দাম যে উচ্চ স্তরে উঠেছে, তা থেকে যায়। এখন দাম শুধু তুলনামূলক ধীরে বাড়ছে।
ভোক্তার আসল প্রশ্ন তাই মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ নাকি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, একই আয় দিয়ে মাস শেষে আগের মতো বাজার করা যাচ্ছে কি না। আপাতত সেই উত্তরটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
দিক বার্তা / এমআরইউএস / ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
