Dik Barta

বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় সরকার’ কারা?

রহিম সোহাগপ্রতিবেদক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ পঠিত মিনিট পড়া
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

আইন বানায় রাষ্ট্র, কিন্তু মানুষের প্রতিদিনের জীবন কি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কেউ?

একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোন হাতে নেন। কারও সঙ্গে কথা বলতে মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করেন, অফিসে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করেন রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ, দুপুরে খাবারের দাম পরিশোধ করেন ডিজিটাল মাধ্যমে, মাসের শেষে বেতন জমে ব্যাংক হিসাবে, বাজার করেন বড় কোনো রিটেইল প্ল্যাটফর্ম থেকে। বাসা কিনতে গেলে ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি করেন, আর দিনের শেষে ইন্টারনেটে সময় কাটান এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে, যার অনেকটাই পরিচালিত হয় কয়েকটি বড় প্রযুক্তি ও সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

রাষ্ট্রের সঙ্গে এই মানুষটির সম্পর্ক আছে ঠিকই। কিন্তু তাঁর প্রতিদিনের জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সরাসরি রাষ্ট্র নেয় না। সেখানে সিদ্ধান্ত আসে ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর, ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, রাইড-শেয়ারিং কোম্পানি, বড় খুচরা বিক্রেতা কিংবা আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। তারা আইন প্রণয়ন করে না, নির্বাচনেও অংশ নেয় না, সংসদেও তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই। তবু তাদের একটি সিদ্ধান্তে একজন মানুষের টাকা আটকে যেতে পারে, ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, যাতায়াতের খরচ বেড়ে যেতে পারে, ব্যবসা থেমে যেতে পারে কিংবা একটি অনলাইন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতাই নতুন একটি প্রশ্ন সামনে আনছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রের পাশাপাশি কি আরেক ধরনের ক্ষমতাকাঠামো তৈরি হচ্ছে? যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার বলা যায় না, কিন্তু নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন যার ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল?

‘দ্বিতীয় সরকার’ কথাটি তাই আক্ষরিক অর্থে কোনো সরকারকে বোঝায় না। বরং এটি এমন সব প্রতিষ্ঠানকে বোঝানোর একটি উপমা, যাদের হাতে নাগরিকজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সেবার নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দিকে তাকালে বিষয়টি বোঝা যায়। কয়েক বছর আগেও ব্যাংক মানে ছিল শাখা, চেক, নগদ অর্থ আর কর্মকর্তা। এখন ব্যাংকের বড় অংশের সেবা চলে গেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। বেতন আসে ব্যাংকে, বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিল পরিশোধ হয় ব্যাংকের মাধ্যমে, ব্যবসার লেনদেন হয় অনলাইনে, কার্ড ও মোবাইল অ্যাপ ছাড়া শহরের মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেকটাই কঠিন। ফলে একটি ব্যাংকের প্রযুক্তিগত ত্রুটি এখন কেবল ওই প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে হাজার হাজার গ্রাহকের জীবনে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, ব্যাংক কেবল টাকা রাখার জায়গা নয়। কে ঋণ পাবেন, কোন ব্যবসা অর্থায়ন পাবে, কোন গ্রাহকের লেনদেন সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হবে এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি ব্যাংক মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে। অবশ্য ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য আইনকানুনের অধীনে পরিচালিত হতে হয়। কিন্তু একজন সাধারণ গ্রাহকের কাছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি-বিধানের চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নির্ধারিত হয় সেই ব্যাংকের নিজস্ব নীতি, প্রযুক্তি ও সিদ্ধান্তে।

মোবাইল অপারেটরদের ক্ষেত্রেও একই রকম পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় মোবাইল ফোন ছিল যোগাযোগের একটি মাধ্যম। এখন একটি ফোন নম্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে ব্যাংকিং, অনলাইন অ্যাকাউন্ট, সামাজিক যোগাযোগ, চাকরির আবেদন, সরকারি সেবা, দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ। ফলে মোবাইল সংযোগ হারানো অনেকের জন্য শুধু ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; ডিজিটাল জীবনের একটি বড় অংশে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।

এখানে কোম্পানির হাতে যে ক্ষমতা এসেছে, তা শুধু প্রযুক্তিগত নয়। একজন গ্রাহক কোন প্যাকেজ পাবেন, কত টাকা দেবেন, কোন সেবা ব্যবহার করবেন, কোনো ক্ষেত্রে কোনো কারণে সংযোগ সীমিত বা বন্ধ হবে কি না—এসব সিদ্ধান্ত তার দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। নিয়ন্ত্রণের জন্য অবশ্যই আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। কোম্পানির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তার বাস্তব প্রতিকার কতটা সহজ?

ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও গভীর করেছে। নগদ অর্থের যুগে একজন মানুষ তার টাকা হাতে রাখতেন। এখন সেই টাকার বড় অংশ একটি ডিজিটাল ব্যবস্থার ভেতরে ঘুরছে। টাকা পাঠাতে, বিল দিতে, অনলাইনে কিনতে কিংবা ব্যবসা করতে মানুষ নির্ভর করছেন বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার ওপর। ফলে একটি প্ল্যাটফর্ম বা পেমেন্ট ব্যবস্থায় সাময়িক বিঘ্নও এখন ব্যক্তিগত অসুবিধার চেয়ে বড় অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, সিদ্ধান্তের একটি অংশ মানুষের চোখের আড়ালে চলে গেছে। আগে ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের একজন ব্যবস্থাপক সিদ্ধান্ত দিতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে সফটওয়্যার, স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থা কিংবা অ্যালগরিদম সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করে। একটি লেনদেন কেন আটকে গেল, একটি অ্যাকাউন্ট কেন সীমিত হলো, একটি প্রস্তাব কেন গ্রহণযোগ্য হলো না—সবসময় গ্রাহক সহজে এর কারণ বুঝতে পারেন না। কিন্তু সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করেন তিনিই।

রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তারও ক্ষমতার এই পরিবর্তনকে স্পষ্ট করেছে। একটি অ্যাপ চালু করলেই এখন একটি শহরের পরিবহন ব্যবস্থার একটি অংশে প্রবেশ করা যায়। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্ম শুধু যাত্রী আর চালককে যুক্ত করে না; ভাড়া নির্ধারণ, চালকের আয়, রেটিং, কাজের সুযোগ এবং যাত্রীর অপেক্ষার সময় সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলে। কখন ভাড়া বাড়বে, কোন চালক কোন যাত্রা পাবেন, কোন আচরণে কার রেটিং কমবে এসবের বড় অংশ নির্ধারণ করে প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব ব্যবস্থা।

এ ধরনের ক্ষমতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের সেবা ছাড়া মানুষ কার্যত চলতে পারেন না। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে একজন গ্রাহক একটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেন। কিন্তু কোনো সেবা যদি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় যে সহজে বিকল্প পাওয়া যায় না, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের বাজারক্ষমতা সামাজিক ক্ষমতায় রূপ নিতে শুরু করে।

এখানেই বড় রিটেইল চেইন, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসগুলোর প্রশ্ন আসে। কয়েকটি বড় প্ল্যাটফর্ম এখন একই সঙ্গে ক্রেতা, বিক্রেতা, পেমেন্ট, সরবরাহ ও বিজ্ঞাপনের নানা স্তর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একজন ছোট উদ্যোক্তার কাছে এসব প্ল্যাটফর্ম বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। আবার একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের নীতি পরিবর্তিত হলে তার ব্যবসার ওপরও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

একই ঘটনা আবাসন খাতেও দেখা যায়। বড় ডেভেলপাররা একটি এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন। নতুন প্রকল্প, সড়ক, বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও আবাসনের বিস্তারের সঙ্গে একটি এলাকার জমির দাম বাড়ে, ব্যবসা বদলে যায়, নতুন শ্রেণির মানুষ সেখানে আসেন। একটি বড় আবাসন প্রকল্প তাই শুধু কয়েকটি ভবন নির্মাণ করে না; অনেক সময় একটি এলাকার ভবিষ্যৎ অর্থনীতির কাঠামোও বদলে দেয়।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—তথ্য। ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু সেবা দেয় না; তারা ব্যবহারকারীর আচরণ সম্পর্কেও বিপুল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। একজন মানুষ কখন কোথায় যান, কী কেনেন, কীভাবে লেনদেন করেন, কোন সেবায় কত সময় থাকেন এসব তথ্য ব্যবসায়িকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে তথ্যের ক্ষমতাও যুক্ত হচ্ছে।

রাষ্ট্রের হাতে নাগরিকের তথ্য থাকা নিয়ে যে বিতর্ক আছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতেও বড় পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য জমা হওয়া নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। পার্থক্য হলো, মানুষ অনেক সময় বুঝতেও পারেন না যে তার তথ্যের কোন অংশ কোথায় যাচ্ছে, কত দিন রাখা হচ্ছে বা কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তাই ‘দ্বিতীয় সরকার’ ধারণাটির আসল জায়গা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বরং এটি ক্ষমতার নতুন বিন্যাস বোঝার চেষ্টা। রাষ্ট্র একসময় নাগরিকের জীবনের প্রধান সংগঠক ছিল। এখন রাষ্ট্রের পাশাপাশি নানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এমন কিছু অবকাঠামো পরিচালনা করছে, যেগুলো ছাড়া নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন চালানো কঠিন।

বাংলাদেশের সামনে তাই নতুন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে কোম্পানি যত বড় হবে, তার সামাজিক জবাবদিহিও কি তত বড় হবে?

বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বেশি ডিজিটাল হবে, এই প্রশ্নগুলো তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ ভবিষ্যতের ক্ষমতা হয়তো শুধু সংসদ ভবন, সচিবালয় কিংবা প্রশাসনের দপ্তরে থাকবে না। ক্ষমতার একটি অংশ থাকবে ডেটা সেন্টারে, পেমেন্ট সিস্টেমে, মোবাইল নেটওয়ার্কে, অ্যাপের অ্যালগরিদমে, ব্যাংকের সার্ভারে এবং বড় প্ল্যাটফর্মের নীতিনির্ধারণী কক্ষে।

রাষ্ট্র আইন বানাবে। কিন্তু মানুষ প্রতিদিন সেই আইন মেনে যে জীবন যাপন করবে, সেই জীবনের অনেকটা পথ দেখাবে বাজারের শক্তি। তাই আজকের প্রশ্ন শুধু “সরকার কী করছে?” নয়। প্রশ্নটি আরও বড়— আমাদের জীবন আসলে কে চালাচ্ছে? আর সেই ক্ষমতার সামনে একজন নাগরিকের হাতে কতটা বিকল্প আছে?

সংবাদটি শেয়ার করুন: