Dik Barta

বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কোথায়?

রহিম সোহাগপ্রতিবেদক
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬১০ পঠিত মিনিট পড়া
ছবি: দিক বার্তা
ছবি: দিক বার্তা

কর্মঘণ্টা ও ছুটির বিধান আইনে থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন; ছাঁটাই, চাকরি স্থায়ী না করা ও প্রাপ্য সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সমন্বিত চাকরিবিধি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

দেশের ব্যাংক, হাসপাতাল, গণমাধ্যম, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান, বিপণন, নির্মাণ, পরিবহন থেকে শুরু করে অধিকাংশ সেবা ও উৎপাদন খাতের বড় অংশই চলছে বেসরকারি কর্মীদের শ্রমে। কিন্তু কর্মঘণ্টা, ছুটি, চাকরির নিরাপত্তা কিংবা অবসরকালীন সুবিধার প্রশ্নে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার। তাঁদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বেসরকারি, যৌথ বিনিয়োগ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এবং আরও ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অর্থাৎ মোট কর্মরত মানুষের ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশই বেসরকারি খাতের সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতে সরকারি খাতে কর্মরত মানুষের হার মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

সংখ্যার হিসাবে দেশের কর্মসংস্থানের বড় ভরকেন্দ্র বেসরকারি খাত। তবে চাকরির শর্ত ও কর্মীদের প্রাপ্য সুবিধায় প্রতিষ্ঠানভেদে রয়েছে বড় পার্থক্য।

বেসরকারি খাতের কর্মীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত সময়ের পরও দীর্ঘক্ষণ কাজ করা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক না পাওয়া, ছুটির দিনেও অফিসের কাজে যুক্ত থাকতে হওয়া, দীর্ঘদিন কাজ করেও চাকরি স্থায়ী না হওয়া এবং হঠাৎ চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা।

দেশের একটি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুতি কিংবা দীর্ঘদিন চাকরির পরও পাওনা না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে কর্মীরা প্রায়ই তাঁদের কাছে আসেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের স্থায়ী করা হয় না এবং মাসিক বেতনের বাইরে অন্য সুবিধার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নীতি থাকে না।

● আইনে ৮ ঘণ্টা, বাস্তবে কত?

বাংলাদেশের শ্রম আইনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের সাধারণ দৈনিক কর্মসময় আট ঘণ্টা এবং সাপ্তাহিক কর্মসময় ৪৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাজসহ দৈনিক কর্মসময় ১০ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজের জন্য সাধারণ হারের দ্বিগুণ হারে ভাতা দেওয়ার বিধানও রয়েছে।

অর্থাৎ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিকের বিধান আইনে অনুপস্থিত নয়।

প্রশ্নটি মূলত বাস্তবায়ন নিয়ে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা জামানও বলেছেন, বিদ্যমান শ্রম আইনে বিভিন্ন সুরক্ষার বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক কর্মী তাঁদের প্রাপ্য সুবিধা পান না।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রম আইনের বাস্তবায়ন দুর্বল থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

● চাকরি গেলেই আয়ের পথ বন্ধ

বেসরকারি চাকরিজীবীদের বড় উদ্বেগের আরেকটি জায়গা চাকরির স্থায়িত্ব।

ব্যবসায় লোকসান, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, ব্যয় সংকোচন কিংবা অন্য কোনো কারণে কর্মী ছাঁটাই হলে অনেকেরই নিয়মিত আয়ের বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না। বাংলাদেশের সব চাকরিজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করে কার্যকর সর্বজনীন বেকারত্ব বিমা ব্যবস্থা এখনো নেই।

ফলে হঠাৎ চাকরি হারানো মানে অনেক পরিবারের জন্য সরাসরি আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।

দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেও কর্মীরা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে চাকরি হারাতে পারেন, কত দিনের নোটিশ পাবেন কিংবা কী পরিমাণ আর্থিক সুবিধা পাবেন, সেসব নিয়েও প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্নতা রয়েছে।

● অবসরের পর কী?

সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন ধরেই পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধার কাঠামো রয়েছে। বেসরকারি খাতের চিত্রটি একরকম নয়।

কিছু প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্য তহবিল, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য অবসর সুবিধা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব সুবিধা সীমিত অথবা নেই।

তবে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বর্তমানে সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিম চালু রয়েছে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই স্কিমে অংশ নিলে কর্মীর চাঁদার ৫০ শতাংশ কর্মী এবং বাকি ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। প্রতিষ্ঠান অংশ না নিলেও কর্মী ব্যক্তিগতভাবে স্কিমে যুক্ত হতে পারেন।

কিন্তু সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়োগকর্তার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়। ফলে চাকরির সঙ্গে অবসর সঞ্চয় নিশ্চিত হওয়ার ব্যবস্থা এখনো সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি।

● অফিসের পরও অফিস

বেসরকারি চাকরিজীবীদের আলোচনায় আরেকটি বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য।

নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে নিয়মিত কাজ, ছুটির দিনেও ফোন বা অনলাইনে অফিসের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে অনেক কর্মীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সময় সংকুচিত হচ্ছে।

কর্মীর উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং মানসিক সুস্থতাও আধুনিক কর্মপরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বিভিন্ন দেশে।

● অন্য দেশে কী আছে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মসময়বিষয়ক বিধানে অতিরিক্ত কাজসহ একজন কর্মীর গড় সাপ্তাহিক কর্মসময় সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টায় সীমিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বছরে অন্তত চার সপ্তাহ বেতনসহ ছুটির অধিকার রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ কর্মী বছরে ৫ দশমিক ৬ সপ্তাহ বেতনসহ ছুটি পাওয়ার আইনি অধিকার রাখেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করা কর্মীর ক্ষেত্রে তা সাধারণত ২৮ দিনের সমান।

সিঙ্গাপুরে কর্মীদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ডে কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়েরই বাধ্যতামূলক চাঁদা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

মালয়েশিয়ায়ও এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে কর্মীদের অবসর সঞ্চয় গড়ে ওঠে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে দেশটিতে বৈধভাবে কর্মরত অধিকাংশ বিদেশি কর্মীকেও বাধ্যতামূলকভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

অর্থাৎ এসব দেশে মাসিক বেতনের পাশাপাশি কর্মঘণ্টা, ছুটি ও ভবিষ্যৎ সঞ্চয়কেও চাকরির কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

● নতুন চাকরিবিধি করছে সরকার

বেসরকারি চাকরিজীবীদের এসব সমস্যা সমাধানে এবার সমন্বিত ‘বেসরকারি চাকরিবিধি’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

গত ১০ মে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ বিষয়ে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহসানুল হক।

প্রস্তাবিত চাকরিবিধিতে ন্যূনতম বেতন, কর্মঘণ্টা, বিভিন্ন ধরনের ছুটি, বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বৈষম্য প্রতিরোধ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধ, চাকরির স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধার আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠন ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং শ্রম বিধিমালা ২০১৫ সংশোধন কিংবা নতুন বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা জামানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত চাকরিবিধি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, সমন্বিত চাকরিবিধি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও সব বেসরকারি খাতকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা সহজ হবে না। কারণ বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ এবং জনবল কাঠামো এক নয়।

● আইন হবে, কিন্তু বাস্তবায়ন?

নতুন চাকরিবিধি শেষ পর্যন্ত কেমন হবে, কবে কার্যকর হবে এবং কতসংখ্যক বেসরকারি কর্মী এর আওতায় আসবেন, সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

কারণ কেবল নতুন বিধি তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যমান শ্রম আইনেও কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিকসহ বিভিন্ন সুরক্ষা রয়েছে। তারপরও বাস্তবে এসব সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ফলে নতুন কাঠামোর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নে।

দেশের দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি কর্মরত মানুষ যখন বেসরকারি খাতে যুক্ত, তখন তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং অবসরকালীন সুরক্ষার প্রশ্ন আর কেবল প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।

এটি দেশের কর্মসংস্থান নীতি এবং কর্মজীবী মানুষের জীবনমানেরও প্রশ্ন।

দিক বার্তা / এমআরইউএস / ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন: