Dik Barta

রাজনৈতিক দলগুলো কেন ভুল স্বীকার করে না?

রহিম সোহাগপ্রতিবেদক
৩০ জুলাই, ২০২৬ পঠিত মিনিট পড়া
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতিবিজ্ঞানে এই প্রবণতা ‘ব্লেম অ্যাভয়ডেন্স’ বা দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে পরিচিত। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো জানে, কোনো ব্যর্থতার দায় স্বীকার করলে ভোট, জনপ্রিয়তা এবং নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাফল্যের দাবিদার পাওয়া যায় খুব দ্রুত। কিন্তু ব্যর্থতার দায় নেওয়ার মানুষ খুঁজতে গেলে শুরু হয় রাজনৈতিক লুকোচুরি। কোনো প্রকল্প সফল হলে সেটি সরকারের দূরদর্শিতা; ব্যর্থ হলে দায় আগের সরকারের।

বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিজেদের কৃতিত্ব; দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র কিংবা অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। বিরোধী দলে থাকলে আবার ঠিক উল্টো হিসাব। এ যেন রাজনৈতিক অঙ্গনের অলিখিত নিয়ম—কৃতিত্ব নিজের, দায় অন্যের।

রাজনীতিবিজ্ঞানে এই প্রবণতা ‘ব্লেম অ্যাভয়ডেন্স’ বা দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে পরিচিত। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো জানে, কোনো ব্যর্থতার দায় স্বীকার করলে ভোট, জনপ্রিয়তা এবং নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষণায়ও দেখা গেছে, দলীয় সমর্থকেরা নিজেদের পছন্দের দলের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপাতে এবং সাফল্যের কৃতিত্ব নিজের দলকে দিতে বেশি আগ্রহী হন।

◉ নদীর দেশ, কিন্তু নদীর অর্থনীতি কোথায়?

তবে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হলেই কোনো চর্চা গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। বাংলাদেশে সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছে দলগুলোর নেতৃত্বকেন্দ্রিক কাঠামোর কারণে। দলের প্রধান বা শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেতরে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সীমিত।

সমালোচনাকে সংশোধনের উপায় না ভেবে দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কথা উল্লেখ করে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

ফলে একটি ভুল সিদ্ধান্তের পর দলের নেতারা প্রথমে সেটি অস্বীকার করেন। প্রমাণ সামনে এলে প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সেটিও সম্ভব না হলে ঘটনার ব্যাখ্যা বদলে দেন। সবশেষে দায় চাপানো হয় বিরোধী দল, আগের সরকার কিংবা অদৃশ্য কোনো ষড়যন্ত্রের ওপর। ষড়যন্ত্র শব্দটির রাজনৈতিক সুবিধা হলো—এর প্রমাণ দিতে হয় না, কিন্তু বক্তৃতায় বেশ ভারী শোনায়।

কোনো মানুষ, সরকার বা রাজনৈতিক দল ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। নীতি নির্ধারণে ভুল হতে পারে, পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থতা আসতে পারে, ভালো উদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তও খারাপ ফল দিতে পারে। ভুল করা অযোগ্যতার প্রমাণ নয়। বরং ভুল বুঝেও অস্বীকার করা এবং সংশোধনের সুযোগ নষ্ট করাই বড় ব্যর্থতা।

একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের কাজ হওয়া উচিত—কী ভুল হয়েছে তা স্বীকার করা, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা চিহ্নিত করা, প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়া এবং সংশোধনের পরিষ্কার পরিকল্পনা জানানো। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমা চাওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ পরিণত গণতন্ত্রে ভুল স্বীকার আত্মবিশ্বাস ও জবাবদিহির পরিচয়।

ডিজিটাল যুগে পুরোনো বক্তব্য, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সরকারি নথি কিংবা ঘটনার ভিডিও পুরোপুরি মুছে ফেলা কঠিন। আজকের অস্বীকারের পাশে গতকালের বক্তব্য কয়েক সেকেন্ডেই হাজির করা যায়। ফলে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে কথার মারপ্যাঁচে আড়াল করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। জনগণকে চশমা পরিয়ে বাস্তবতা বদলে দেওয়ার রাজনীতি হয়তো খুব দ্রুত বিলুপ্ত হবে।

◉ রাজনীতিতে লাভ কার—জনগণের, নাকি নেতার?

তবে প্রযুক্তি একাই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে না। দলীয় সমর্থকেরা যদি তথ্যের চেয়ে পরিচয়কে বড় করে দেখেন, গণমাধ্যম যদি সব বক্তব্য যাচাই ছাড়া প্রচার করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে দায় নির্ধারণ না করে, তাহলে মিথ্যা অস্বীকারও রাজনৈতিক আশ্রয় পাবে।

বাংলাদেশে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার রাজনীতি অসম্ভব নয়। তবে তার জন্য সরকারকে মানতে হবে, বিরোধী দল শত্রু নয়; আর বিরোধী দলকেও স্বীকার করতে হবে, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেশবিরোধী নয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন।

আগামীর রাজনীতিতে এগিয়ে থাকবে তারাই, যারা ভুলহীন হওয়ার অভিনয় না করে ভুল সংশোধনের সক্ষমতা দেখাবে। কারণ জনগণ নিখুঁত নেতা খোঁজে না; খোঁজে সৎ, জবাবদিহিমূলক এবং শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃত্ব। ভুল স্বীকার করলে মর্যাদা কমে না। বরং দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাপাতে একসময় রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাই নিঃশেষ হয়ে যায়।

দিক বার্তা / এমআরইউএস / ৩০ জুলাই ২০২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন: