Dik Barta

বাংলাদেশের দুধের ৪১ নমুনার সবকটিতেই মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

রহিম সোহাগপ্রতিবেদক
২৯ জুলাই, ২০২৬ পঠিত মিনিট পড়া
গবেষকরা দুধের প্রতিটি নমুনায় প্লাস্টিক কণা খুঁজে পেয়েছে | ছবি: দিক বার্তা
গবেষকরা দুধের প্রতিটি নমুনায় প্লাস্টিক কণা খুঁজে পেয়েছে | ছবি: দিক বার্তা

বাংলাদেশের কাঁচা দুধ, প্যাকেটজাত দুধ ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যের সব নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা প্রবেশের সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষকের পরিচালিত গবেষণায় পরীক্ষা করা ৪১টি নমুনার প্রতিটিতেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণাটির শিরোনাম ‘Microplastics Contamination of Milk and Milk Products in Bangladesh: Characterization, Dietary Exposure and Risk Assessment’। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে এর প্রবেশের সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তৃত গবেষণা।

গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন সানাউল্লাহ মাজুমদার। তার সঙ্গে গবেষণায় অংশ নেন রেহেনুমা তারান্নুম, মো. মোশিউজ্জামান আদনান, তানজুম কবির খুকু, মো. রাসেল আলী, শাহুদা ইসলাম সোয়া, মো. আবদুর রাকিব, আলম তাজ আরা অর্থী, মো. মামুন ইসলাম ও মো. ওমর ফারুক। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩–২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

সব নমুনাতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

গবেষণায় মোট ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১৭টি কাঁচা দুধ, ১২টি ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধ এবং ১২টি অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য। কাঁচা দুধের নমুনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়, আর ব্র্যান্ডের পণ্য সংগ্রহ করা হয় বাজার ও সুপারশপ থেকে।

নমুনাগুলো পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর মাইক্রোস্কোপ ও ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (FTIR) প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিকের ধরন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা হয়।

ব্র্যান্ডের দুধে সবচেয়ে বেশি কণা

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬.০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। কাঁচা দুধে এ সংখ্যা ছিল গড়ে ৯৩.৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০.৮০টি।

গবেষকদের ধারণা, দুধ সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণে ব্র্যান্ডের দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পাইপ, ফিল্টার, গ্লাভস, যন্ত্রপাতি, প্যাকেট এবং পরিবেশ থেকেও এসব কণা দুধে প্রবেশ করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো উৎস থেকে কত পরিমাণ কণা এসেছে, তা এই গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়নি।

আঁশের মতো কণাই বেশি

গবেষণায় পাওয়া অধিকাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল স্বচ্ছ, আঁশের মতো এবং আকারে ২৫০ মাইক্রোমিটারের কম। কাঁচা দুধে পাওয়া কণার প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং ব্র্যান্ডের দুধে প্রায় ৮৩ শতাংশ ছিল আঁশ আকৃতির।

এছাড়া পরীক্ষায় টেফলন (PTFE), পিইটি (PET), নাইলন-৬, পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিভিসি, পলিস্টাইরিনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে।

শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি

বয়স, শরীরের ওজন এবং দুধ গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনায় গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু, যারা নিয়মিত ব্র্যান্ডের দুধ পান করে, তাদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষকদের সুপারিশ

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ একটি উদীয়মান খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ। এ ঝুঁকি কমাতে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, উন্নত ফিল্টার ব্যবস্থা চালু করা, কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই গবেষণায় ব্যবহৃত ঝুঁকি সূচকগুলো দূষণের মাত্রা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার সরাসরি প্রমাণ বা পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত নয়।

দিক বার্তা / এমআরইউএস / ২৯ জুলাই ২০২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন: